সাংবাদিক আইফাত ইসলাম -ঃঃ বর্তমান সময় তথ্যপ্রযুক্তির—এক ক্লিকেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের হাতে। কিন্তু এই দ্রুততার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বড় সংকট: সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি যেখানে সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ, সেখানে বাস্তবতা বলছে—অনেক ক্ষেত্রে এই আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ঘটছে। ফলে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ হয়ে উঠছে বিভ্রান্তি, গুজব ও চাঞ্চল্যের বাহক। ইতিহাসের ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ আজ ডিজিটাল যুগে নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
হলুদ সাংবাদিকতার সূচনা উনিশ শতকের শেষভাগে, বিশেষ করে ১৮৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে। সে সময় দুই সংবাদপত্র মালিক—Joseph Pulitzer এবং William Randolph Hearst—এর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তাঁদের পত্রিকা New York World ও New York Journal পাঠকসংখ্যা বাড়ানোর জন্য চটকদার শিরোনাম, অতিরঞ্জিত তথ্য এবং যাচাইবিহীন সংবাদ প্রকাশে ঝুঁকে পড়ে। এই প্রতিযোগিতাই ধীরে ধীরে জন্ম দেয় ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র, যেখানে তথ্যের নির্ভুলতার চেয়ে গুরুত্ব পায় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ।
এই ধারার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল বড় ও ভয় উদ্রেককারী শিরোনাম, গুজবভিত্তিক সংবাদ, কাল্পনিক সাক্ষাৎকার এবং ব্যক্তিগত বা অপরাধসংক্রান্ত বিষয়কে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা কমেনি; বরং প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশে এই প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে—যাকে অনেকেই ‘অপ-সাংবাদিকতা’ বলে অভিহিত করছেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সংবাদ প্রচারের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কিছু গণমাধ্যম বা কনটেন্ট নির্মাতা যাচাই-বাছাইয়ের চেয়ে ‘ক্লিক’ বা ‘ভিউ’ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে চটকদার শিরোনাম, বিভ্রান্তিকর থাম্বনেইল এবং অর্ধসত্য তথ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ডিজিটাল হলুদ সাংবাদিকতা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতার প্রভাব উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন জনমতকে বিভ্রান্ত করছে। বিশেষ করে নির্বাচন বা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে একপাক্ষিক তথ্য প্রচার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সংখ্যালঘু বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার ঘটনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। ডিপফেইক ভিডিওর মাধ্যমে এখন এমন কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব, যেখানে কোনো ব্যক্তি এমন কিছু বলছেন বা করছেন বলে মনে হয়—যা বাস্তবে ঘটেনি। একইভাবে উন্নত এআই টুল ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি, যা সহজেই মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ফলে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখানোর ফলে মানুষ অনেক সময় এমন এক তথ্য-চক্রে আটকে যায়, যেখানে সে শুধুমাত্র নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিল থাকা তথ্যই দেখে। এতে করে গুজব বা অপপ্রচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে যায়।
এর সামাজিক প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনামহানি ঘটছে—বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে অপপ্রচার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃতীয়ত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের মধ্যে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে—যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, সংবাদমাধ্যমের ভেতরে কঠোর নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেকিংকে বাধ্যতামূলক সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের মধ্যে মিডিয়া লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও উদ্যোগ জরুরি। এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করার ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে আইনগত কাঠামো এমন হতে হবে, যা একদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করবে, অন্যদিকে অপব্যবহার প্রতিরোধ করবে।
সবশেষে বলা যায়, হলুদ সাংবাদিকতা কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়—এটি বর্তমানের একটি বাস্তব সংকট। ডিজিটাল যুগে এর প্রভাব আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। তাই সত্যনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায়, তথ্যের এই বন্যায় সত্য হারিয়ে যাবে, আর আস্থাহীনতার এই সংকট সমাজকে আরও অস্থির করে তুলবে।