সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে এক সময় লবণাক্ততার কারণে আমন মৌসুম শেষে বিস্তীর্ণ জমি অনাবাদী পড়ে থাকত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে দিয়েছে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণভিত্তিক ‘মিনি পুকুর’ প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে সংরক্ষিত মিষ্টি পানি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমে তরমুজ চাষ করে সফল হচ্ছেন আশাশুনি ও শ্যামনগরের প্রান্তিক কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে সাতক্ষীরা জেলায় ৪৭১ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে, যার বেশিরভাগই
আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায়। ‘ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন’ প্রকল্পের আওতায় খনন করা মিনি পুকুরগুলোই এখন এসব এলাকায় সেচের প্রধান উৎস।
এই মিনি পুকুরগুলোকে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন ‘মিষ্টি পানির ব্যাংক’। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমে এসব পুকুর পূর্ণ হয়, যা পরবর্তীতে শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়। সোলার বা ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে সেই পানি জমিতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
আগে যেখানে ফসলহীন পড়ে থাকত জমি, সেখানে এখন সারি সারি তরমুজের খেত। কৃষকদের মতে, বোরো ধানের তুলনায় তরমুজ চাষে পানি কম
লাগে এবং লবণাক্ত মাটিতেও ভালো ফলন হয়। ফলে এটি এখন লাভজনক বিকল্প হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বড়দল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সত্যরঞ্জন বৈরাগী জানান, গত বছর বিঘাপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাভ হওয়ায় এবার তিনি নিজেই ১০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। যদিও উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে, তবুও ফলন ভালো হওয়ায় লাভের আশা করছেন তিনি।
জামালনগর গ্রামের কৃষক আফছার গাজীর সাফল্যের গল্প এখন এলাকায় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। গত মৌসুমে ১৬ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করে প্রায় ৮ লাখ টাকা মুনাফা করেছেন তিনি। তার ভাষায়, “আগে লোনা জমিতে কিছুই হতো না, এখন সেই জমিতেই সোনা ফলছে।
আরেক চাষি মাসুম সরদার জানান, তিনি এবার ৭০ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। বিঘাপ্রতি গড়ে ৭০০–৮০০টি তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে। খরচ বাদে প্রতি বিঘায় প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।
তরমুজ চাষের বিস্তারে উপকূলীয় অঞ্চলে নারীদের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। প্রতিদিন কয়েকশ নারী ৪০০ টাকা মজুরিতে চারা পরিচর্যা ও মাঠের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ঝর্ণা রানী নামে এক শ্রমিক জানান, “আগে এই সময়ে কাজ থাকত না, এখন তরমুজের খেতে কাজ করে সংসারে সহায়তা করতে পারছি।
শ্যামনগর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৫২ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের তরমুজ এখন উপকূলের মাঠে চাষ হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, লবণাক্ত মাটিতেও সঠিক পানির ব্যবস্থাপনা থাকলে তরমুজ চাষ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। মিনি পুকুর প্রযুক্তিই এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।”
তিনি আরও জানান, সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধির ফলে তরমুজ চাষের বিস্তার ঘটছে। ভবিষ্যতে হিমাগার ও সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এই চাষ উপকূলীয় অঞ্চলের স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে
উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণভিত্তিক এই প্রযুক্তি উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।