তারা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে গড়ে তোলেন কোটি মানুষের ভাবনা, সাজসজ্জা, এমনকি জীবনবোধ।কেউ মেকআপ শেখান, কেউ ‘মোটিভেশনাল’ কথা বলেন, কেউ আবার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান কেবল মানুষের মনোযোগ টানার প্রয়াসে।এবার চলুন চিন্তা, সংস্কৃতি ও আচরণেরও পথপ্রদর্শক ইসলামী জীবন বিধান এই নতুন সামাজিক বাস্তবতাকে কিভাবে দেখে?
খ্যাতি এক মায়াবী আলোকরেখা, যা অনেক সময় মানুষকে আল্লাহর স্মৃতি থেকে দূরে নিয়ে যায়। কোরআন বলে, ‘আমি আখিরাতের ঘর তাদের জন্য বানিয়ে রেখেছি, যারা পৃথিবীতে বড়াই চায় না এবং ফাসাদ সৃষ্টি করে না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৮৩)এখানে ‘বড়াই’ শুধু বাহ্যিক অহংকার নয়, বরং নিজের প্রভাব বিস্তারে আত্মতৃপ্ত হওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।অথচ আজকের ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি অনেকাংশেই গড়ে উঠেছে লাইক, কমেন্ট, ফলোয়ার আর সাবস্ক্রাইবার নামক এক ভার্চুয়াল পূজার মঞ্চে।খ্যাতি এখন পরিণত হয়েছে ‘ইলাহ’ বা উপাস্য-সদৃশ আসক্তিতে—যার তরে মানুষ ত্যাগ করছে নৈতিকতা, সততা এমনকি ঈমানি সংযমও।কোরআন স্মরণ করায়—‘আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)কজেই খ্যাতির মানদণ্ড অনুসারীর সংখ্যা নয়; বরং খ্যাতির মানদণ্ড তাকওয়া ও নৈতিক সততা।
আরেক হাদিসে তিনি তুলনা দিয়েছেন— ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে ছাগলের পালে ছেড়ে দিলে যে ক্ষতি হয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে কারো সম্পদ ও খ্যাতির লোভ তার ধর্মের।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৬)
এই শিক্ষাগুলো যেন আজকের ইনফ্লুয়েন্সার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—যেখানে জনপ্রিয়তার জন্য মানুষ মিথ্যা প্রচার, অশ্লীল প্রদর্শন, এমনকি শরীয়ত-বিরোধী হাস্যরসেও লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না।
ইসলামী স্কলারদের ব্যাখ্যা
সমকালীন আলেম শায়খ সালেহ আল-ফাওজান বলেন—‘খ্যাতি এমন এক পরীক্ষা, যা মানুষকে ধ্বংস করে দেয় যদি সে তার নিয়ত ও আমলকে খাঁটি না রাখে।
অতএব, জনপ্রিয়তা যদি হয় দাওয়াহ, জ্ঞান বা কল্যাণের হাতিয়ার—তা বরকতপূর্ণ; কিন্তু যদি হয় আত্মপ্রদর্শনের উপকরণ, তবে তা আধ্যাত্মিক আত্মহত্যা।
ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতির অন্ধকার বাস্তবতা
অশ্লীলতা ও দৃষ্টি লঙ্ঘন: বেশিরভাগ কনটেন্টই দর্শক টানার উদ্দেশ্যে শালীনতার সীমা ভাঙে। অথচ কোরআন নির্দেশ দেয়—‘মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে।’ (সুরা নূর, ৩০)
সময় অপচয় ও আসক্তি : ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফলোয়ার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে অনেকে নামাজ, ইলম ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন— ‘দুই নিয়ামতে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় থাকে : স্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)
ভুয়া জীবনধারা : অনেকে বিলাসিতার অভিনয় করে সাধারণ মানুষকে হিংসা, হতাশা ও ঋণের ফাঁদে ফেলে।
রাসুল (সা.) বলেছেন— ‘তোমাদের চেয়ে নিচু অবস্থার লোকদের দিকে দৃষ্টি দাও।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৬৩)
গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানো : সোশ্যাল মিডিয়ায় যাচাই-বাছাইহীন প্রচারণা কোরআনের নিষেধ অমান্য করে— ‘যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে সংবাদ আনে, তবে তোমরা তা যাচাই করো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
ইনফ্লুয়েন্সারদের ইতিবাচক ভূমিকা
সব ইনফ্লুয়েন্সার মাত্রই যে ক্ষতিকর—তা নয়। বরং অনেকে এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছেন ইসলামি জ্ঞান, নৈতিক অনুপ্রেরণা ও সমাজকল্যাণ প্রচারে। রাসুল (সা.) বলেছেন— ‘যে লোক সৎ পথে আহ্বান করে, সে সেই পথের অনুসারীদের সমান সওয়াব পাবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৭৪)
একজন আল্লাহভীরু ইনফ্লুয়েন্সার যদি তার দক্ষতা ব্যবহার করেন মানুষকে দীনমুখি করতে, তবে তার প্রতিটি ভিডিও হতে পারে একেকটি সদাকাহ জারিয়াহ।
আমাদের করণীয়
• নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা: জনপ্রিয়তা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই হবে চূড়ান্ত লক্ষ্য।
• শরীয়তসীমা রক্ষা: বিনোদন থাকতে পারে, কিন্তু শালীনতার সীমা অতিক্রম নয়।
• সত্যনিষ্ঠ উপস্থাপনা: গুজব নয়, যাচাই করা তথ্যই দাওয়াহর মূল উপাদান।
• সময় ও দায়িত্বের ভারসাম্য: সোশ্যাল মিডিয়া যেন ইলম, ইবাদত ও পারিবারিক দায়িত্ব থেকে দূরে না সরায়।
ইন্টারনেট ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি আমাদের সময়ের এক অনিবার্য বাস্তবতা। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না; বরং এর সঠিক ব্যবহারের পথ নির্দেশ করে। খ্যাতি যখন দাওয়াহর বাহন হয়—তা আলোকিত পথ; আর যখন তা আত্মম্ভরিতা ও পাপের হাতিয়ার হয়—তা হয় অন্ধকার গহ্বর।
এই যুগে একজন সত্যিকারের মুসলিম ইনফ্লুয়েন্সারের দায়িত্ব হলো প্রভাবের মঞ্চে আল্লাহর বাণীকে প্রাধান্য দেওয়া, যাতে প্রযুক্তির এই স্রোত মানবতার জন্য হয়ে ওঠে নূরের তরঙ্গ, ফিতনার জোয়ার নয়।