প্রতিটি যুগের মানুষের অন্তরে ছিল অন্তর্নিহিত এক খোঁজ। সেটি সঠিক পথ, ন্যায় ও সত্যের অনুসন্ধানের খোঁজ। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, পথহারা মানুষকে আলোকিত করার জন্য অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরিত হয়েছেন। তবে একজন এমনও আছেন, যিনি কেবল নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য আলোর বাতিঘর হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।
তিনি হলেন মুহাম্মদ (সা.)। যাঁর জীবন ও আদর্শ মানবতার জন্য চিরন্তন দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.)-কে নিয়ে নিজ অনুভব প্রকাশ করে কবি আল মাহমুদ বলেছেন-
গভীর আঁধার কেটে ভেসে ওঠে আলোর গোলক
সমস্ত পৃথিবী যেন গায়ে মাখে জ্যোতির পরাগ,
তাঁর পদপ্রান্তে লেগে নড়ে ওঠে কালের দোলক
বিশ্বাসে নরম হয় আমাদের বিশাল ভূভাগ।
পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে পথহারা মানুষকে সঠিক পথের নির্দেশনার জন্য যত নবী-রাসুল প্রেরিত হয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবাই নির্দিষ্ট এলাকা বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মনোনীত হয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন।একমাত্র মুহাম্মদ (সা.) এমন একজন প্রেরিত রাসুল; যিনি কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র ভূপৃষ্ঠে আগত মানুষের হিদায়াতের জন্য প্রেরিত হয়েছেন।মহানবী (সা.)-এর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সততা, আন্তরিকতা আর আদর্শ দেখে যুগে যুগে বহু মনীষী অভিভূত হয়েছেন। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে অভ্যস্ত কারো পক্ষে তাঁর অতুল ব্যক্তিত্বের অনন্য প্রভাব, মহোত্তম মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠ গুণাবলির কথা স্বীকার না করার কোনো উপায় নেই। কারণ, মানব সভ্যতার সবচেয়ে সমৃদ্ধ পর্যায়গুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)-এর অতুলনীয় মহত্ত্ব ও গুণের ছাপ ছিল স্পষ্ট।মহানবী (সা.)-এর আদর্শ সম্পর্কে অমুসলিম পণ্ডিতদের কিছু মূল্যায়ন— Michael H. Hart তাঁর লিখিত বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ The 100 : A Ranking of the Most Influential Persons In History-তে লিখেছেন, ‘মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় শীর্ষস্থান দেওয়াটা অনেক পাঠককে আশ্চর্যান্বিত করতে পারে এবং অন্যদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সেক্যুলার এবং ধর্মীয় উভয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ সফল ছিলেন।
সম্ভবত ইসলামের ওপর মুহাম্মদ (সা.)-এর তুলনামূলক প্রভাব খ্রিস্টান ধর্মের ওপর যিশু ও সেইন্ট পলের সম্মিলিত প্রভাবের চেয়েও বেশি। আমি মনে করি, ধর্মীয় ও সেক্যুলার উভয় ক্ষেত্রে প্রভাবের এই বিরল সমন্বয় যোগ্য ব্যক্তি হিসেবেই মুহাম্মদ(সা.)-কে মানবেতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী একক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত করেছে।’
আমেরিকার সর্বপ্রথম ‘ম্যান অব লেটার’ এবং ‘ফাদার অব আমেরিকান লিটারেচার’ নামে পরিচিত বিখ্যাত লেখক Washington Irving তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ Muhammad-এর ২০ পৃষ্ঠায় ঐতিহাসিক আবুল ফিদার সূত্রে লিখেছেন, “একজন মানুষের পরিপূর্ণ সৎ ও পুণ্যবান হতে যতগুলো গুণে গুণান্বিত হতে হয় মহান প্রভু তাঁর মাঝে এর সবকটি গুণের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি এতটাই বিশুদ্ধ ও নির্মল প্রকৃতির অধিকারী ছিলেন যে স্বাভাবিকভাবে তিনি সবার কাছে ‘আল-আমিন’ নামে পরিচিত ছিলেন।প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস যা বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর মাঝে স্থিতি লাভ করেছিল আর তাঁর নম্রতা তাঁকে বরাবরই তর্ক-বিতর্ক সালিসির ক্ষেত্রে বিচারক ও মীমাংসাকারীর আসনে সমাসীন করেছিল।”মি. ইরভিং তাঁর আলোচ্য গ্রন্থের ১৯২ ও ১৯৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলি ছিল নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ও অতিমানবীয়। তাঁর ছিল দ্রুত উপলব্ধি করার সক্ষমতা, তেজস্বী স্মৃতিশক্তি, এক জীবন্ত ও প্রাণবন্ত কল্পনাশক্তি আর সৃজনশীল জেনিয়াস…।’ এরপর ১৯৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘সামরিক বিজয়গুলো কখনোই তাঁর মনে কোনো গর্ব কিংবা দম্ভের জন্ম দেয়নি। তিনি বাস্তবে নিজের স্বার্থে এ অভিযানগুলো করতেন না।চরম দুঃখ আর দারিদ্র্যের মাঝে তাঁর চরিত্রে যেমন সারল্যের প্রলেপ স্পষ্ট অনুভূত হতো, তেমনি যখন তিনি বিজয়ের সিঁড়ির সর্বোচ্চ সোপানে দাঁড়িয়েছিলেন; তখনো তাঁর চরিত্র ছিল এক ও অভিন্ন…।’
বহু গ্রন্থের প্রণেতা Mr James A. michener ‘দ্য রিডার্স ডাইজেস্ট’ পত্রিকার জুন ১৯৫৫ সংখ্যার ৭৯ পৃষ্ঠায় Islam the misunderstood Religion নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ইসলাম যেভাবে অতি দ্রুতগতিতে গোটা বিশ্বে বিস্তৃতি লাভ করেছিল, সেভাবে অন্য কোনো ধর্ম বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি। মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই ইসলাম আরবের একটি বৃহত্তম অংশে কর্তৃত্ব লাভ করেছিল। পরবর্তী সময়ে অতি দ্রুতই তা সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর, আধুনিক রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ভূখণ্ডগুলোসহ উত্তর আফ্রিকার মধ্য দিয়ে স্পেনের প্রাচীর পর্যন্ত বিজয়াভিযান চালিয়েছিল। এর সবই সম্ভব হয়েছিল মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বোত্তম স্বভাব ও অতিমানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।’
আধুনিক ভারতের জনক Mahatma Gandhi বলেন, ‘আমি জীবনগুলোর মধ্যে সেরা একজনের জীবন সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম, যিনি আজ কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান নিয়ে আছেন। যেকোনো সময়ের চেয়ে আমি বেশি নিশ্চিত যে ইসলাম তরবারির মাধ্যমে সেই সব দিনগুলোতে মানুষের জীবনধারণ পদ্ধতিতে স্থান করে নেয়নি। ইসলামের প্রসারের কারণ হিসেবে কাজ করেছে নবীর দৃঢ় সরলতা, নিজেকে মূল্যহীন প্রতিভাত করা, ভবিষ্যতের ব্যাপারে সতর্ক ভাবনা, বন্ধু ও অনুসারীদের জন্য নিজেকে চরমভাবে উৎসর্গ করা, তাঁর অটল সাহস। এ সবই মুসলমানদের সকল বাধা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।’
প্রিয় পাঠক, মহানবী (সা.)-এর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করা শুধু ইতিহাসের পাঠ নয়, এটি জীবনের পথপ্রদর্শকও বটে। আমাদের ছোট ছোট কাজ, দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যদি তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী হয়, তবেই আমরা সত্যিকারের আলো এবং শান্তির পথে হাঁটছি বলে ভাবার সুযোগ পাবো।
পরিশেষে বলব, এমন নবীর উম্মত হতে পেরে আমরা প্রত্যেকেই ধন্য। কারণ এই নবীর উম্মত হওয়ার জন্য যুগে যুগে বহু নবী-রাসুল পর্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। মহান আল্লাহ আমাদের মহানবী (সা.)-এর দেখানো পথ ও মতে জীবন চালানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।