একই চিত্র রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলাতেও। এখানে ৬০ জনেরও বেশি মাংস ব্যবসায়ী রয়েছেন, কিন্তু কারো কাছে লাইসেন্স নেই। এমনকি জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা পর্যন্ত করা হয় না।
তারাগঞ্জের এক ব্যবসায়ী হাসিনুর ইসলাম জানান, মাংস ব্যবসার জন্য প্রাণিসম্পদ থেকে লাইসেন্স নিতে হয়- এটা আগে জানতাম না। কয়েক দিন আগে মিটিংয়ে শুনেছি। এখন লাইসেন্স নেব। আমরা অসুস্থ পশু জবাই করি না, তাই স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন মনে করিনি। শেড দখলে থাকায় গরু বাইরে জবাই করতে হয়।
অ্যানথ্রাক্সে নতুন করে আক্রান্ত রোগীর খবর পেয়ে চিকিৎসক ও সচেতন মহল আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গবাদিপশুর শ্লেষ্মা, লালা, রক্ত, মাংস, হাড়, নাড়িভুঁড়ির সংস্পর্শে এলেই মানুষ এই রোগে সংক্রমিত হতে পারে। এটি গবাদিপশু থেকে মানুষে ছড়ায়, তবে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে সাধারণত প্রথমে চামড়ায় ঘা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি হলো গবাদিপশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া এবং অসুস্থ পশু জবাই বন্ধ করা।
স্থানীয়রা মনে করছেন, সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা কার্যক্রম না চালালে অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মাংস ব্যবসায়ীদের অনিয়ম আর প্রশাসনের তদারকির ঘাটতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে শীতের আগে রোগটি নতুন আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রংপুরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রুহুল আমিন বলেন, এটা শুধু পীরগাছা নয়, পরবর্তী সময়ে কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরেও একই ধরনের উপসর্গের রোগী পেয়েছি। ইতিমধ্যে আরো আট রোগীর নমুনা আইইসিডিআরে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এখনো আসেনি। অসুস্থ গবাদিপশু জবাই না করতে এবং এর মাংস না খেতে সবাইকে অনুরোধ করছি। আমাদের কাছে অ্যান্টিবায়োটিক পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ আছে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এই রোগ প্রাণী থেকে ছড়ায়, প্রতিরোধে মূল কাজ প্রাণিসম্পদ দপ্তরের।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু ছাইদ জানানজেলায় ১৩ লাখের বেশি গরু, ছাগল ও ভেড়া আছে। গত ২৬ আগস্ট থেকে পীরগাছা, কাউনিয়া, মিঠাপুকুর ও রংপুর সদরের ১ লাখ ৬৫ হাজার গবাদিপশুকে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে। অ্যানথ্রাক্স নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। প্রাণিসম্পদ বিভাগ মসজিদ, মন্দির, হাটবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালাচ্ছে। নতুন করে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গবাদিপশু পাওয়া যায়নি।
রংপুর বিভাগের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. আব্দুর হাই সরকার বলেন, মাংস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নিতে উদ্বুদ্ধ করছি আমরা। নিয়মিত পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে চাই। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে প্রতিটি হাটে চিকিৎসক পাঠানো সম্ভব হয় না। তারপরও স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে হাট-বাজারগুলোতে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার চেষ্টা চলছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, যথাযথ লাইসেন্স ও স্বাস্থ্য সনদ ছাড়া মাংস ব্যবসা চলতে থাকলে রোগ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সফল হবে না। জনবল সংকট কাটিয়ে প্রতিটি হাটে পশু স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং টিকা কার্যক্রম আরো জোরদার করার পাশাপাশি অসুস্থ পশু জবাই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।