শালবন চৌধুরী
তৎকালীন কুমিল্লা শহরের রামঘাট তথা রামঘাটলা। কুমিল্লা মহানগরের অতি পরিচিত ও ঐতিহ্যমন্ডিত নাম। সেই জায়গাটি জুড়ে ‘রামঘাট’ লেখাটি এখনো রয়েছে। একটি শ্বেত পাথরে খচিত অবস্থায় থেকে ‘রামঘাট’ ফলকটি যেন দীর্ঘদিন ধরে মুখ লুকিয়ে বলতে চেয়েছে, ‘‘হে মনুষ্যগণ আমাকে নিয়মিত না হোক, দিনে একবার করে হলেও শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে দাও অথবা আমার নামের অধিকারটুকু ফিরিয়ে দাও। চলার পথে আমার নামটি চোখে দেখতে না পেয়ে এড়িয়ে যেও না আমায়। আমি বাঁচতে চাই, তোমাদের সেবায় লাগতে চাই।”
কুমিল্লার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাধারণ মানুষ যে জায়গাটি দিয়ে কুমিল্লা মহানগরের কেন্দ্রস্থল কান্দিরপারে প্রবেশ করে, তার নাম রামঘাট। লোকে বলে রামঘাটলা। এ জায়গাটি কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী একটি স্থান। এর সন্নিকটেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মহেশাঙ্গন ও কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড। পরিতাপের বিষয় এই যে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলতে ইচ্ছে হয়, হায় রামঘাট, তুমি কি আছো? না বেলা শেষে কিঞ্চিৎ অবশিষ্ট ঐতিহ্য রক্ষার সংকটে চূড়ান্ত ভোগান্তিতে উঁকি মেরে যাচ্ছো অবিরল; না সত্ত্বাধিকার খুঁজে হয়রান! ঘাট সংলগ্ন পুকুরের জল আরও স্বচ্ছ রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে এমন চিরচেনা রামঘাটটিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে আমাদের কুমিল্লার স্বীয় সকল ঐতিহ্য ক্রমাগত বিনাশ করে দেয়া যেন আজ লৌকিকতায় পরিণত হয়েছে। আর পুরনো মানেই ফেলনা, এটা সঠিক নয়। অথচ এমনই বিবেচনায় হুমকির মুখে পড়েছে মহানগরের সবচেয়ে ব্যস্ততম জায়গার নিরব স্বাক্ষী রামঘাটটিও। এটা মেনে নেয়া শুভকর কিংবা সুখকর কোনোটিই নয় নিশ্চয়।
ভোরের আলোয় একদা কুমিল্লার এ রামঘাটকে যারা দেখেছিলেন, তারা আজকের এ ঘাটের দৈন্যদশা দেখে নিশ্চয়ই বিমর্ষ হবেন। রোদ ঝলমল দিনে যারা একদা পড়ন্ত বিকেলে কুমিল্লা রামঘাটে বসে পুকুরের স্বচ্ছ জলরাশির সৌন্দর্য অবলোকন করেছেন, তারা আজকের অনান্দনিক ও বিশৃঙ্খল এবং বিলুপ্ত ও ক্ষীণকায় ঘাট দেখে এবং ভেবে ভারাক্রান্তই হবেন। আর জল ভরা ওই পুকুরে দিন শেষের সূর্যের কিরণ ঢলে পড়ার দৃশ্য এখন বলা যায় অনেকটা উবেই গেছে।
কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালার অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক শ্রী ইন্দ্রকুমার সিংহ একদা এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, একদা পেতলের পুজোর সামগ্রী নিয়ে প্রতি সকালে আমাদের মা-বোনেরা এ বাঁধানো চওড়া ঘাটে তাদের দিনের কাজকর্ম শুরু করতেন। সন্ধ্যায় ধুপ ধুনো আর ফুলের হাল্কা গন্ধ চারদিক ভরে যেত। আর এখন! কোথায় কী! তিনি আরও বলেন, ভারতের চিত্রকূটকে বলা হয় গরিব মানুষের বারানসি। যারা বেনারস গিয়ে উঠতে পারে না, তারা চিত্রকূট যান। বিশ্বনাথের দর্শন না পেয়ে রামচন্দ্রের প্রতিই তারা মনোনিবেশ করেন। রাম নামাঙ্কিত অনেক স্থান, ভাস্কর্য, পাহাড়, মেলা, সড়ক, ঘাট বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। রামঘাট রয়েছে আরও অনেক জায়গায়ও। তবে এগুলোর যথাযথ সংরক্ষণও হচ্ছে। তাই কুমিল্লার রামঘাটের ঐতিহ্যও পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। যদি আমরা সভ্যতার রক্ষক হই, যদি আমরা ঐতিহ্যের ধারক বাহক বলে নিজেদের মেনে নেই, তাহলে যেন কুমিল্লার এই ঐতিহ্যের চিহ্নটুকুকে হারিয়ে যেতে না দেই। ইন্দ্রকুমার সিংহ আরও বলেছিলেন, কুমিল্লা মহানগরীর এ রামঘাটের ইতিবৃত্ত পূর্ণাঙ্গভাবে তার জানা নেই। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, এ রামঘাট নিঃসন্দেহে কুমিল্লার ঐতিহ্যের অংশ।
রামঘাট সংশ্লিষ্ট পুকুরপাড়ের মালিকানা স্বত্ব নিয়ে একদা মামলা সংক্রান্ত জটিলতা ছিল। এ মামলা এখন নিষ্পত্তি হয়েছে কী না, সর্বশেষের এ তথ্য জানা যায়নি।
এ ঐতিহ্যবাহী রামঘাট সংলগ্ন পুকুরটির রক্ষণাবেক্ষণে আমাদেরকে আরও আন্তরিক হতে হবে।