মো.আকতার হোসেন,খাগড়াছড়ি
পাহাড়ের চলমান পরিস্থিতির কারণে খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় ৮ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ২৪ দিনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে ভরা মৌসুমে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। দৈনিক ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।জেলার প্রধান পর্যটনকেন্দ্র আলুটিলা, রিছাং ঝরনা, জেলা পরিষদসহ সব পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। পূজার ছুটিতে তিন দিনের বন্ধে পর্যটকে মুখরিত থাকার কথা থাকলেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে লোকসানের মুখে পড়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।খাগড়াছড়ি আবাসিক হোটেল সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও হোটেল গাইরিংয়ের স্বত্বাধিকারী অন্তত বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ে সহিংসতার পর কোনো পর্যটক আসেনি। কিন্তু আমাদের হোটেলসহ অন্যান্য আবাসিক হোটেলে কোনো কক্ষ বরাদ্দ হয়নি। অর্থাৎ এই অবস্থায় কোনো পর্যটক আসবে না। খাগড়াছড়ি পর্যটনশিল্প অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত। এখানে পর্যটনের সাথে পরিবহন শ্রমিক, কৃষিখাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’অন্তত বিকাশ ত্রিপুরা আরও বলেন, ‘খাগড়াছড়ি জেলা সদরে আবাসিক হোটেলে সংখ্যা প্রায় ৩৫। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি আবাসিক হোটেল সমিতির অন্তর্ভুক্ত ২৫টি হোটেল। পর্যটক না থাকায় হোটেল মালিকদের দৈনিক ক্ষতি অন্তত ২৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ। সেই হিসেবে এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক।’আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের টিকিট কাউন্টারে দায়িত্বরত কোকোনাথ ত্রিপুরা বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে আলুটিলায় ৫০০ থেকে ৬০০ দর্শনার্থী আসেন। ছুটির দিনে প্রায় ১ হাজারেরও বেশি দর্শনার্থী আসেন। অথচ এখন কেউ নেই। সাজেকে পর্যটক ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, তার প্রভাব এখানেও পড়েছে। সরকারি রাজস্ব আদায় প্রায় শূন্যের কোঠায়।’আলুটিলা কফি হাউস অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক মো.মামুন বলেন, ‘আমাদের বেহাল অবস্থা। কোনো পর্যটক নেই। সামনে পূজার বন্ধ, টানা তিন দিনের বন্ধ ছিল। কিন্তু এখন যা অস্থিরতা সেটা না কাটলে পর্যটক সমাগম হবে বলে মনে হয় না। আমাদের প্রতিদিনই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।’চলতি বছর জুলাই মাসজুড়ে চলা ছাত্র আন্দোলন, আগস্টে সরকার পতনকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই মাস পাহাড়ে পর্যটনে ভাটা পড়েছিল। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় পাহাড়ে পর্যটক সমাগম বাড়ছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মামুন হত্যাকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়িতে সহিংসতা শুরু হয়, সেটি রাঙামাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। সহিংসতা ও হামলার প্রতিবাদে ২১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর তিন দিনের অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ি ও সাজেকে পর্যটকেরা আটকা পড়েন।
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে সাজেকে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এতে খাগড়াছড়িও প্রায় পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ে। মূলত সেই থেকে খাগড়াছড়ির পর্যটনে খরা শুরু হয়। যা এখনও চলমান। এ ছাড়া গত ১ অক্টোবর (মঙ্গলবার) ধর্ষণের অভিযোগে এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় খাগড়াছড়িতে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়। এতে মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক বেড়েছে।খাগড়াছড়ি আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সহসভাপতি স্বপন দেবনাথ বলেন, ‘পাহাড়ের বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে খাগড়াছড়ির পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। এখানে দীর্ঘ সময় পর্যটকনির্ভর ব্যবসা চলছে। আমরা অচিরেই শান্তিপূর্ণ একটা পরিবেশ প্রত্যাশা করি। এরই মধ্যে পর্যটন ও পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’চলমান অবস্থার কারণে পর্যটন খাতে ক্ষতির কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আমরা সমন্বয় করছি। নতুন করে যাতে কোনো সহিংসতা না হয় সে জন্য উপজেলাগুলোতেও সম্প্রীতি সভা করেছি। পর্যটকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারেন, তেমন একটা পরিবেশ আমরা তৈরি করছি। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে পর্যটকেরা আবারও ভ্রমণ করতে পারবেন।’