মোঃ নাজমুল হোসেন
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে হাতি দিয়ে চাঁদাবাজি করে আসছে কতিপয় ব্যক্তিরা। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অলিগলি এবং সড়কে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল বন্ধ করে হাতি দিয়ে টাকা নিতে প্রায়ই দেখা যায়। একপ্রকার ভয়ে ও বাধ্য হয়ে হাতিকে চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে মনে করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পথচারীরা। ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠানের পণ্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে টাকা গুঁজিয়ে দেন। তবে এসব বিষয়ে কেউ কথা বলে না; কারা হাতি নিয়ে চাঁদাবাজি করছে? কে থামাবে হাতির এই চাঁদাবাজি?—এমন প্রশ্ন জেগেছে জনেমনে।
হাতির পিঠে চুপ করে বসে থাকেন মাহুত। তার ইশারায় এক দোকান থেকে আরেক দোকানে যায় হাতি। ১০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে নিচ্ছে দোকানদের কাছ থেকে। যতক্ষণ পর্যন্ত শুঁড়ের মাথায় টাকা গুঁজে না দেবে, ততক্ষণ শুঁড় সরায় হাতি; স্থানও ত্যাগ করে না। আবার টাকা না পেলে প্রশিক্ষিত এই প্রাণীটি ক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চ স্বরে হুংকার ছাড়ে। আর টাকা পেলে শুঁড় দিয়ে মাহুতকে দিচ্ছে। আর পথচারীদের অনেকে আনন্দ পেয়ে টাকা দিলেও, বেশির ভাগই বন্য প্রাণী দিয়ে টাকা তোলাকে অনৈতিক বলছেন। এ বিষয়ে ডিএমপি বলছে, ডিএমপির প্রতিটি মিটিংয়ে হাতি দিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়ে আলোচনা হয়। যেখানে এমন সংবাদ পাওয়া যাবে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আর বন্য প্রাণী দমন অপরাধ ইউনিট বলছে, হাতি লালনপালনের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। যারা হাতি নিয়ে দোকানে দোকানে এভাবে টাকা তোলে, এটা নিঃসন্দেহে অপরাধ। কিছুদিন আগে হঠাৎ করে এক বিরাট হাতি নিয়ে এক মাহুত হাজির হন রাজধানীর সিকসন এলাকায়। সেখানে হকার থেকে শুরু করে প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে হাতি দিয়ে টাকা তোলা হয়। সিকসনের চা ব্যবসায়ী মাসুদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দোকানে অনেক কিছু সাজানো থাকে। হাতিটি যদি দোকানের মালপত্র নষ্ট করে, এ ভয়ে কিছু বলি না। যেভাবে শুঁড় এগিয়ে দেয়, ভয়ে টাকা কে না দেবে? না দিলে তো দাঁড়িয়ে থাকে, জোরে জোরে হুংকার করে। আরেক ব্যবসায়ী এগিয়ে এসে বলেন, শুধু সিকসন নয়, রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় হাতি দিয়ে চাঁদাবাজি এখন প্রায়ই দেখা যায়। তাই ব্যবসায়ীদের দাবি, দ্রুত যেন এসব চাঁদাবাজি বন্ধ করার উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। হাতি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি হচ্ছে রাজধানীতে। এসব চাঁদাবাজি থামানোর জন্য পুলিশ কি কোনও ব্যবস্থা নেবে? জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ফারুক হোসেন বলেন, ‘হাতি দিয়ে হোক আর হিজড়ারা হোক—এসব চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের কমিশনার স্যারের কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে। ডিএমপির প্রতিটি মিটিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। এমন সংবাদ যেখানে পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ডিসি আরও বলেন, ‘ঢাকা শহরে এমনিতে যানজট। তার ওপর যদি বিশালদেহী হাতি সড়কে নামে বা কোন গলিতে ঢোকে, তাহলে যানজটও বাড়ে, মানুষের চলাচলের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যারা হাতি নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়ায়, দোকানে দোকানে টাকা তোলে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ প্রসঙ্গে বন্য প্রাণী দমন অপরাধ ইউনিটের পরিচালক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, ‘হাতি লালনপালনের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। যিনি হাতি লালন-পালন করবেন, তাকে শর্ত মেনেই করতে হবে। হাতি আগে কীভাবে ব্যবহার হতো, সেটাও সবাইকে জানতে হবে। দুর্গম এলাকায় মালামাল পরিবহন, সার্কাস অনুষ্ঠান, হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে যাওয়া শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য এখন আর নেই। সুতরাং হাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে তাকে পর্যাপ্ত খাবারও দিতে হবে। আর এই খাবার দিতে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু হাতির মালিক এত টাকা পাবেন কোথায়? পরিচালক আরও বলেন, এই আধুনিক যুগে হাতি দিয়ে মালামাল পরিবহন তো প্রশ্নই আসে না। তবে যারা হাতি নিয়ে দোকানে দোকানে এভাবে টাকা তোলে, এটা নিঃসন্দেহে অপরাধ। হাতি নিয়ে বর্তমানে আলোচনা হচ্ছে। সবাই মিলে আলোচনা করে একটা সমাধানের পথে যেতে হবে। হাতিগুলোকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।’