ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়নের তিনলাখ পীর এলাকায় একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্ভাবনাময় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকায় শিল্পায়নের গতি বাড়বে এবং বিপুলসংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কসবা উপজেলার সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন এলাকাবাসী।
এদিকে, ইপিজেড স্থাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)-এর চেয়ারম্যানের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিনাউটি ইউনিয়নের তিনলাখ পীর এলাকা ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রোথ সেন্টার হিসেবে পরিচিত।
কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়কের ৩ লাখ পীর এলাকা: বাংলাদেশের নতুন মডেল ইপিজেড গড়ার সুপার-স্ট্র্যাটেজিক স্থান
কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়কের ৩ লাখ পীর ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে দ্রুতই গুরুত্ব অর্জন করছে। এই অঞ্চলটি দেশের তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক করিডোরকে একসাথে যুক্ত করে—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট। একই সাথে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে মাত্র এক ঘণ্টার সড়ক দূরত্ব এ এলাকাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অবস্থানগত সুবিধা
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর: সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টার দূরত্ব
ঢাকা: তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার দূরত্ব
সিলেট: মাত্র তিন ঘণ্টার পথ
ভারতের আগরতলা: প্রায় এক ঘণ্টার সড়ক দূরত্ব
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সাথে এমন উন্নত ও দ্রুত যোগাযোগ যে কোনো বড় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা ও রপ্তানি নির্ভর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অসাধারণ সুবিধা সৃষ্টি করে।
জমি ও অবকাঠামোর প্রস্তুতি: ইপিজেড স্থাপনের সর্বোত্তম পরিবেশ
এলাকাজুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ খালি ভূমি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি খাস জমি। পাশাপাশি স্থানীয়দের আগ্রহের কারণে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করাও অত্যন্ত সহজ।
স্থানীয় মানুষজন শিল্পায়নকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত—যা বাংলাদেশের অন্য বহু অঞ্চলে দেখা যায় না।
এই সমন্বয় একে একটি পূর্ণাঙ্গ ইপিজেড (Export Processing Zone) গড়ার জন্য আদর্শ জায়গায় পরিণত করেছে।
ভারী শিল্প ও রপ্তানিমুখী কারখানার জন্য আদর্শ ভিত্তি: আশুগঞ্জ–আখাউড়া করিডোর
এই সম্ভাবনাময় অঞ্চলের চারপাশে অবস্থিত বাংলাদেশের শক্তিশালী শিল্প–অবকাঠামো:
আশুগঞ্জ নদী বন্দর — আমদানি–রপ্তানির দ্রুততম রুট
আখাউড়া রেলওয়ে জংশন — অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদেশীয় রেল সংযোগ
আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র — জাতীয় গ্রিডের অন্যতম শক্তি কেন্দ্র
তিতাস গ্যাস ফিল্ড — দেশের প্রধান গ্যাস সরবরাহ এলাকা
আরও রয়েছে কসবায় অবস্থিত সালদা, কাশীরামপুর ও তারাপুর গ্যাসক্ষেত্র, যেখানে পর্যাপ্ত কূপ খননের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। শিল্পাঞ্চল গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবহনের সমন্বিত প্রাপ্যতা—এখানে সবই প্রস্তুত।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উচ্চ আগ্রহ
ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী বেশ কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারী এই অঞ্চলকে সম্ভাব্য ইপিজেড হিসেবে বিবেচনা করছেন।
কম খরচে জমি, বন্দর–রেল–সড়ক–বিদ্যুৎ–গ্যাসের সন্নিবিষ্ট সুবিধা এবং ভারতের সীমান্তবর্তী অবস্থান এ অঞ্চলে রপ্তানিমুখী আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য একটি আধুনিক মডেল ইপিজেড গড়ার সুযোগ
উপযুক্ত পরিকল্পনা, স্বল্প সময়ে কূপ খনন ও অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পন্ন করা গেলে কুমিল্লা–সিলেট মহাসড়কের এই অঞ্চলটি সহজেই বাংলাদেশের সর্বাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মডেল ইপিজেড হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এটি শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়—ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট তিনটি বিভাগের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি যোগ করবে। পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবাণিজ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সংযোগে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। পাশাপাশি আখাউড়া রেলওয়ে জংশন ও স্থলবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় পণ্য পরিবহন ও কাঁচামাল সংগ্রহে এলাকাটি বিশেষ সুবিধাজনক।
রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় এ অঞ্চলকে শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত উপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবেদনে আরও বলা হয়, এলাকায় বিপুলসংখ্যক প্রবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা বিদেশে অর্জিত দক্ষতা দেশে কাজে লাগাতে পারবেন। ফলে ইপিজেড স্থাপিত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
এ উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন কসবা উপজেলার বাসিন্দারা।
পাশাপাশি কসবা উপজেলায় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তারা।
এবিষয়ে আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়া জানান,বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছি। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ ক্রমেই একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বাজার সুবিধা এবং কৌশলগত সংযোগ—সব মিলিয়ে আজ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে একজন বিনিয়োগকারী কার্যত অর্ধ পৃথিবীর বাজারে প্রবেশাধিকার লাভ করেন।
বাংলাদেশের তিনদিক জুড়ে রয়েছে ভারতের বিশাল বাজার; অপরদিকে মিয়ানমার পথ ধরে চীন ও পূর্ব এশিয়ার সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত। রয়েছে Chittagong Port—যা দেশের বাণিজ্য ও রপ্তানি সম্ভাবনার প্রাণকেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান গন্তব্যগুলো মাত্র ৫ ঘণ্টার উড়ান দূরত্বে, ফলে বৈশ্বিক লজিস্টিক চেইনে বাংলাদেশ একটি সুবিধাজনক হাবে রূপ নিচ্ছে।
এই বৃহত্তর সম্ভাবনার ভেতর ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিঃসন্দেহে সবচেয়ে উদীয়মান এবং আকর্ষণীয় অঞ্চলগুলোর একটি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সিলেট, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের দূরত্ব মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা; আর ভারতের আগরতলা মাত্র ৪০ মিনিটের পথ। এর ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রকৃত অর্থেই একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য জংশন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এ অঞ্চলে বিদ্যমান জ্বালানি অবকাঠামো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রয়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রসমূহের একটি—Titas Gas Field—যা দেশের মোট গ্যাসচাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করে। পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা অঞ্চলে অবস্থিত সালদা, তারাপুর ও কাশীরামপুর গ্যাসক্ষেত্র, এবং নিকটবর্তী Ashuganj Power Station—সমগ্র এলাকাটিকে একটি শক্তিশালী জ্বালানি-সমৃদ্ধ সম্ভাব্য শিল্পাঞ্চলে পরিণত করেছে।
প্রস্তাবিত ইপিজেড এলাকার পাশ দিয়ে তিতাস নদীর একটি খাল প্রবাহিত হওয়ায় পানি ব্যবস্থাপনা, নিষ্কাশন বা বর্জ্য পরিবহন—সবকিছুই অত্যন্ত সুবিধাজনক হবে। রয়েছে পর্যাপ্ত জমি, পরিবহন সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি আধুনিক ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করলে জ্বালানি, পানি, লজিস্টিক, শ্রমশক্তি এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ—সবদিক থেকেই এটি একটি ‘প্রমিজিং ইনভেস্টমেন্ট জোন’ হবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি—এই অঞ্চলে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা পেলে আমি বিদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে সক্ষম হবো। এতে শুধু কর্মসংস্থানই নয়, বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।
এই সম্ভাবনাময় উদ্যোগের অংশীদার হতে পারলে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবো। একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে—উনার যুগোপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহসী সিদ্ধান্তের কারণে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আজ আরও উন্মুক্ত ও প্রতিশ্রুতিশীল হয়ে উঠেছে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা,দ্রুত সময়ের মধ্যে ইপিজেড প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কসবা উপজেলায় কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।