মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন খান
আবাসিক খাতে গত এক যুগ ধরে আত্মস্বীকৃত অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারি গ্রাহকদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকার। এসব গ্রাহক এখনো বাসাবাড়িতে অনুমোদন ছাড়াই গ্যাস ব্যবহার করছে। বিষয়টি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, পেট্রোবাংলা ও জ¦ালানি বিভাগ জানলেও এসব গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কার্যত কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। তিতাসের কিছু অসাধু চক্র মাসিক চুক্তিভিত্তিক প্রতি বাসা থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা মাসোহারা নিয়ে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগকে দিনের পর দিন সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দেদারছে চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা শহরের সবচেয়ে আলোচিত ঘনবসতি জোন মিরপুর এলাকা, এখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগের ছড়াছড়ি। দক্ষিণ পিরের বাগে এসব অবৈধ লাইন ২০১৩ সাল থেকে যাদের বাসাবাড়ি ছিল টিনসেড আকারে, তাদেরকেই এসব অবৈধ সংযোগ তিতাসের অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজেশে দেয়া হয়। বাসা বাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন খাবার হোটেলে চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে এসব অবৈধ সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তিতাসের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা। প্রি পেইড মিটার ব্যবস্থা চালু থাকলেও তাদের সেদিকে আগ্রহ নেই। এলাকার বাড়িওয়ালারা চায় এভাবে অবৈধ সংযোগ চলমান থাকুক। দক্ষিণ পিরেরবাগে সাবেক পুলিশের একশ্রেণীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাসায় এই অবৈধ সংযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। সিকদার মঞ্জিল,দক্ষিণ পিরেরবাগ আশেপাশের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে এই অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। একযুগ ধরে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ চলমান থাকলেও কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। শুধু কাগজে কলমেই রয়ে যায় এই অভিযান।
তিতাস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আবাসিক খাতে আত্মস্বীকৃত অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার ৫০০ এর মতো। এসব গ্রাহক সবাই ডাবল বার্নারের চুলা ব্যবহার করেন। এই পরিমাণ চুলায় মাসে ২৪ লাখ ৩০ হাজার ঘনফুট গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহা হয়। ডাবল বার্নারের প্রতি চুলার বর্তমান মাসিক বিল ১০৮০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি মাসে এসব অবৈধ চুলার বিপরীতে তিতাসের লোকসান ৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বছরে লোকসান ৫২ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে এসব গ্রাহক অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করছে। সে হিসাবে গত ১২ বছরে তিতাসের ক্ষতি হয়েছে ৬২৯ কোটি টাকা।২০১৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তৎকালিন সরকারের নির্দেশে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ ছিল। জানা গেছে, আবাসিক খাতে গ্যাসের সংযোগ সরকার বন্ধ করে দিলেও তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঠিকাদারদের সহযোগিতায় ব্যাপক হারে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়। ২০১০ সালের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত আবাসিকে ৫৭ হাজার ৪১৪ টি অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়। অবৈধ এসব সংযোগের বিপরীতে ২০১১ অর্থ বছরে ১১৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা হলেও বৈধ না হওয়ায় ওই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। পরে সরকার ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবৈধ আবাসিক গ্যাস সংযোগ বৈধ করার সুযোগ দেয়। সারা দেশের অবৈধ গৃহস্থালির গ্যাস সংযোগ বৈধ করতে ওই বছরের ২০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। গ্যাস বিপণন নীতিমালা ২০০৪ অনুযায়ী ফ্ল্যাট রেটে এক বছরের বিল ও তিন মাসের বিলের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা দিয়ে অবৈধ সংযোগ বৈধ করা যাবে বলে জানানো হয়। কিন্তু সরকারের বেধে দেওয়া সময়ের ভেতরে মাত্র ১৬ হাজার ৯১৪ টি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বৈধ করা হয়। এদিকে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী কালীন সরকার সারা দেশে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান জোরদার করে। দেশের সব বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাসে অবৈধ সংযোগের পরিমাণ সব চেয়ে বেশি। অন্তর্বর্তী কালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিতাস কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বড় অভিযান পরিচালনা করে সাবেক বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের পৈত্রিক ও নির্বাচনী এলাকা কেরানীগঞ্জে। গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে অভিযানে ৮৩টি বাণিজ্যিক ও শিল্পের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আবাসিকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে ৩৩ সংযোগ। তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, তিতাসের একটি এলাকা থেকে এতগুলো অবৈধ শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা এটাই প্রথম। সাবেক বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা হওয়ার কারণে বিগত সরকারের আমলে কেরাণীগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান চালাতে পারেনি তিতাস কর্তৃপক্ষ।সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত কেরানীগঞ্জের মতো সারাদেশে এভাবে তিতাস অভিযান পরিচালনা করলে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে সরকারের রাজস্ব খাতে আরো বেশি আয় হবে বলে তারা মনে করেন।