হাবিবুর রহমান মুন্না
একসময় গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ গৃহস্থের বাড়িতেই ছিল কাচারি ঘর। কাচারি ঘর ছিলো গ্রাম বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য,কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একটি অংশ। কালের বিবর্তনে আজ কাচারি ঘর বাঙালির সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। গেস্টরুম কিংবা ড্রয়িং রুমের আদি ভার্সন কাচারি ঘর এখন আর গ্রামীণ জনপদে কাচারি ঘর দেখা যায়না। আদিকালে মূল বাড়ি থেকে একটু দূরে আলাদা খোলামেলা জায়গায় কাচারি ঘরের অবস্থান ছিল । অতিথি, পথচারী কিংবা সাক্ষাত প্রার্থীরা এই ঘরে এসেই বসতেন। প্রয়োজনে এক-দুই দিন রাত- যাপনেরও ব্যবস্থা থাকতো কাচারি ঘরে। কাচারি ঘর ছিল বাংলার অবস্থাসম্পন্ন ও মধ্যবিত্তের গৃহস্থের আভিজাত্যের প্রতীক বলা যায়। চারিদিকে ঢেউ টিনের বেড়া সাথে কাঠের কারুকাজ করে উপরে টিন অথবা শনের ছাউনি থাকতো কাচারি ঘরে। যা অতি প্রাকৃতিক বান্ধব পরিবেশ দ্বারা আবেষ্টিত ছিল। তখনকার যুগে বৈদ্যুতিক পাখা না থাকলে কাচারি ঘড় ছিল আরামদায়ক শীতল পরিবেশ। তীব্র গরমেও কাচারি ঘড়ের খোলা জানালা দিয়ে হিমেল বাতাস বইতো। আলোচনা, শালিস বৈঠক, গল্প-আড্ডার আসর,বসতো কাচারি ঘরে। আগের দিনে নিজেদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে মানুষজন বেশি হলে ছেলেরা কাচারি ঘড়ে থাকতো আর মেয়েরা থাকতো ভিতর বাড়িতে। বর্ষা মৌসুমে গ্রামের লোকজনদের উপস্থিতিতে কাচারি ঘরে বসতো পুঁথি পাঠ ও জারি গান । পথচারীরা এই কাচারি ঘরে ক্ষনিকের জন্য বিশ্রাম নিতেন। বিপদে পরলে রাত যাপনের ব্যবস্থা থাকতো কাচারি ঘরে। গৃহস্থের বাড়ির ভিতর থেকে খাবার পাঠানো হতো কাচারি ঘরের অতিথিরদের জন্য। আবাসিক গৃহশিক্ষকের (লজিং মাস্টার)ও আরবী শিক্ষার ব্যাবস্থার জন্য কাচারি ঘড়ের অবদান অনস্বীকার্য। মাস্টার ও আরবী শিক্ষকগণ কাচারি ঘড়ে থাকার ব্যবস্থা থাকার ব্যাবস্থা করা হতো। কোন কোন বাড়ির কাচারি ঘর সকাল বেলা মক্তব হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। জানা যায়, ঈশা খাঁর আমলে কর্মচারীদের খাজনা আদায়ের জন্য কাচারি ঘর ব্যবহার করা হতো। জমিদারী প্রথার সময়ও খাজনা আদায় করা হতো গ্রামের প্রভাবশালী গ্রাম্যমোড়লের বাড়ির সামনের কাচারি ঘরে বসে। এখন আর কাচারি ঘর তেমন চোখে পরেনা। কুমিল্লার গোমতী নদীর ওপারে সীমান্তবর্তী এলাকা,শাহপুর, শাওয়ালপুর, গোলাবাড়ি, জেলার দেবিদ্বারের, বুড়িচং, মেঘনা,দাউদকান্দির এলাকার কিছু গ্রামে অত্যন্ত জীর্নশির্ন ভাবে কাচারি ঘর দেখতে পাওয়া যায়। দাদা ও বড় বাবার ঐতিহ্য হলো কাচারি ঘর। কালের স্বাক্ষী হয়ে সংস্কারের অভাবে আজো অযত্ন অবহেলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কাচারি ঘর। গোমতী নদীর ওপারে শাহপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মো. আবদুল বারেক জানান, আমার দাদা০ আম্বর আলী সর্দার এর আমলে আমরা কাচারি ঘর দেখেছি। সেখানে মেহমানরা আসতেন ও বৈঠক এবং দেনদরবার হতো। নগরীর ১৫০ বছরের উপরে নগরীর প্রাচীন কাটাবিল কাটাবিল মুন্সীবাড়ীর মোহাম্মদ রুহুল আমিন সাবের ভোরের কলামের প্রতিবেদককে জানান, আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটি কাচারি ঘর ছিল। আমরা দাদা মকবুল আহমেদ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের এফ এ পাশ করেন। যে বছর ভিক্টোরিয়া কলেজের পথচলা শুরু সে বছর ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন সে আমলে আমাদের একটি কাচারি ঘর ছিল ৩৮ কি ৪০ বছর আগে তা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।নগর ইতিহাসবিদ আহসানুল কবির ভোরের কলামকে জানান, প্রাচীন জনপদের ইতিহাস থেকে জানা যায়, কাচারি ঘরের কনসেপটা প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। মূল ঘর থেকে একটু বাইরে কাচারি ঘড়ের অবস্থান থাকতো। আগের দিনে দিনে যার কাচারি ঘর যত সুন্দর তাকে ঠিক সেভাবে মূল্যায়ন করা হতো। যারা মেহমান কিন্তু পরিবারের সাথে ওইরকম ভাবে ঘনিষ্ট আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ না তাদেরকে কাচারি ঘরে থাকতে দেয়া হতো। সামাজিক বিআার, দেনদরবার,আগের দিনের একেবারে প্রাথমিক শিক্ষার শুরুটা কাচারি ঘর থেকে হতো। এখন কাচারি ঘর বিলুপ্তির পথে। কাচারি ঘর এখন দেখা যায় না। খুবকদাচিৎ চোখে পরলে তা অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন ইতিহাসের একটি অংশ কাচারি ঘর। যেখানে দু একটি আছে তা রক্ষা করা দরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।